সংসারের মৃত্যু । Songsarer Mittru । Family Deaths । বাংলা গল্প

কবি ও কবিতা

রাত নয়টার ফ্লাইটে খলিল মিয়া ঢাকা ত্যাগ করবেন। যাবেন বিদেশ টাকা রোজগারের জন্য । বেলা এগারোটার মধ্যে বাড়ি থেকে বিদায় নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। সাথে এগিয়ে দিতে কালুর মামা যান।
দু-মাস মাস পেরিয়ে যায় খলিল মিয়ার কোন খোঁজ খবর পাওয়া যাচ্ছে না। বাড়ির সবাই চিন্তায় খাওয়া দাওয়া ছেড়েই দিয়েছে। বীণা শুধু জানতে চায় বাবা কবে আসবে মা ? বাবার কথা খুব মনে পড়ছে।
তাহের মিয়া বাহির থেকে ডাকছেন, কালু ঘরে আছিস ? এই নি তোর বাপের চিঠি এসেছে। কালু দ্রত ঘরের বাহিরে এসে চিঠিটা নিয়ে বীণা ও মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ছে। সবার মনে একটা অজানা আশঙ্কা, না জানি কী খবর ! চিঠি পড়া শেষ, মনটা মোটামুটি শান্ত হল । 
এভাবেই খলিল মিয়ার বিদেশ কাল পাঁচ বছর পেরিয়ে গেল। বিদেশ থেকে নিয়মিত টাকা পাঠান। সেই টাকা দিয়ে দুই সন্তানের পড়াশোনাসহ সংসার চলছে।

খলিল মিয়া পাঁচ ক্লাস পর্যন্ত লেখা পড়া করেছিলেন তারপর আর লেখাপড়া করার ভাগ্য হয়নি। তিনি অন্যের জমি বর্গা চাষ করতেন, সারাদিন কাজ করে রাতে ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। ছেলে কী লেখাপড়া করছে তা দেখার জন্যে দুই মাইল দূরে নিজের কাজ বাদ দিয়ে মাঝে মাঝে কালুর স্কুলে যান। কালু তার নানার বাড়িতে থেকে ওখানের স্কুলে পড়ে। ক্লাসে ঊপস্থিতি কম। তাতে খলিল মিয়া সন্তুষ্টি হতে পারেন না। ওই স্কুল বাদ দিয়ে আবার নিজের গ্রামের স্কুলে ভর্তি করে দেন। এভাবেই চলতে থাকে ।
    পরীক্ষা শেষে ভাই বোন মিলে নানা নানীর বাড়ি বেড়াতে যায়। ওখান থেকে মেঝ মামীর মেয়ে হয়েছে তাকে দেখতে যাবে তাদের বাড়িতে। নৌকায় চড়ে যাবে। নৌকায় চড়ে আত্মীয় বাড়ি যাওয়ার মজাই আলাদা। এক লাফে নৌকা থেকে নেমে দৌড়ে মামীর বাড়ির দিকে চলে যায়।
    কী সুন্দর চেহারা ! আকাশ থেকে যেন চাঁদ খানা ছিড়ে এসেছে, আর তা সবাই দেখছে। বীণা বলল, ভাইয়া কিছু ভাবছো?
    কী আর ভাববো বিধাতার সৃষ্টি দেখলাম ।
    দুপুরের খাওয়া শেষ করে বিকেলের দিকে ওরা সবাই আবার বাড়ি ফিরলো। বীণা বলল, ভাইয়া মেয়েটি নাম কি রেখেছে?
   ঝরনা ।
   কী সুন্দর নাম ! মনে হয় পাহাড় থেকে কলকল শব্দে জল নামছে, তাই না?
   কবি হয়ে গেলি নাকি?

খলিল মিয়া ভাবছেন এই অভাবের সংসারে কিভাবে সন্তান দুটোকে মানুষ করব ! বিদেশ গেলে কেমন হয় ! কিন্তু এত টাকা পাব কোথায় ? যেখানে দু-বেলা দু-মুঠো ভাত জোটে না, সেখানে আবার বিদেশ !
      বছিরন বিবি কাঁধে হাত দিয়ে বললেন, কি ভাবছো ?
      ভাবছি এই অভাবের সংসার আর কত দূর ! সন্তানদের লেখাপড়া করাতে হবে। বিদেশ গেলে কেমন হয়?
      ঠিক কথা বলেছো। আমার বাপের বাড়ি থেকে হাজার বিশেক টাকা আনতে পারবো আর বাকি টাকা আমাদের ঘরের পূর্ব দিকের জমিটা বিক্রি করলে হয়ে যাবে।
      বাপের পুরানো জমিটা বিক্রি করলে তো আর কিছুই থাকলো না। থাক যাবো না।
      জমি দিয়ে তুমি কি করবে, সন্তানদের যদি শিক্ষিত করতে না পারলে? এতোকাল তো অন্যের কাছে মুজুরী খাটতেই গেল।
      খলিল মিয়া ভাবলো যুক্তিটা মন্দ হয় না। সন্ধ্যা দিকে কালু ও বীণা বাড়ি ফিরল। মা, মা, বলে মাকে জড়িয়ে ধরলো ওরা ভাই বোন। বছিরন বিবি বলেন, সাত দিন যেন সাত বছরের মত মনে হয়েছে। বীণা বলে মা আমরা ভাই বোন যদি কোথাও হারিয়ে যাই তাহলে তুমি কি করবে? 
      অমন কথা বলতে নেই। তোরা আমার প্রাণ তোরা আমার জীবন।
      কাদের মিয়া দাঁড়িয়ে সন্তান ও বউয়ের দৃশ্য দেখে ভাবছেন, এই সন্তানদের রেখে কেমনে আমি বিদেশ গিয়ে থাকবো ! কেমনে দু-চোখের আড়াল করে রাখবো ! পরক্ষণে আবার নিজেকে বুঝায়। সন্তান ও স্ত্রীর এই হাসি ভরা মুখ দেখতে চাইলে আমাকে বিদেশ গিয়ে টাকা উপার্জন করতেই হবে, এই আমার প্রতিজ্ঞা। 
      বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফল হয়েছে। কালু প্রথম হয়েছে। বাপ ছেলেকে নিয়ে যে আশা করতেন আজ তার বাস্তবায়ন শুরু । খলিল মিয়া বুক ভরে নিঃশ্বাস নিয়ে খোদার কাছে দোয়া করছেন- তুমি বাজানরে অনেক জ্ঞান বুদ্ধি দান করো।

      গ্রামের দুষ্ট ছেলেদের সাথে কালু চলাফেরা করে। রাত দশটার সময় বাড়ি ফেরে। একদিন ওর মা বলেন, তোর এই ব্যবহারের জন্য কী তোর বাপ বিদেশ থাকতেছে এত কষ্ট করে?
      স্কুলের গন্ডি কালু এখনো পার করতে পারেনি। লেখাপড়ায় তেমন ভালো না। বাড়ি থেকে প্রতিদিন স্কুলের কথা বলে যায় কিন্তু স্কুলে যায়না, কোথায় যেন চলে যায়। ক্লাসের উপস্থিতি খুবই কম। মায়ের কথা কালু শুনে না। ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণীর বার্ষিক পরীক্ষায় দুইবারই ফেল। তবুও সে খবর বাপকে জানানো হয়নি।
      মায়ের কথায় কালু কোন জবাব দেয় না। ঘরে গিয়ে বসে ভাবে, আমি ভালো হয়ে যাবো। ভালো ভাবে লেখাপড়া করবো। বাবা মায়ের আশা পূরণ করব। পরের দিন সকালে কালু স্কুলে যায় । আজ কোন স্কুল পালানো নয়, সরাসরি ক্লাসে যাচ্ছে। পথে তার একই বয়সের অনেকেই বলল, আবার স্কুলে যাওয়া শুরু করলি নাকি? কালু বলে কি আর করবো, এভাবে আর কতদিন বাউন্ডুলে হয়ে ঘুরবো? তোরাও আমার পথে যোগ দে।
     রাত অনেক হয়েছে। বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিলে কী সময়ের কথা মনে থাকে ! পথ দিয়ে যাচ্ছে আর বিন্দিয়ার কথা ভাবছে। হঠাৎ উহ্‌ শব্দে কালু মাটিতে পড়ে গেল। মাথা থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। আর কিছু মনে নেই।
      ঘটনাটা দুদিন আগেই হয়েছে। স্কুলে গানের অনুষ্ঠান ছিল। সেখানে কালু ও বিন্দিয়াসহ অনেকেই গান গেয়েছে। ভালো গানের জন্য পুরস্কারে ব্যবস্থাও ছিল। কালু ও বিন্দিয়া তা পায়। বিন্দিয়ার চাচাতো ভাই ববিও গান গেয়েছিল কিন্তু পুরস্কার পায়নি।
      স্যার হাত তুলে কালু ও বিন্দিয়াকে ভালো গানের জন্য প্রশংসা করে। ববির তা সহ্য হয়নি। পরের দিন কালু ও বিন্দিয়া হাতে হাত রেখে অনেকক্ষণ হেঁটে হেঁটে গল্পও করেছে, তা ববি দেখেছে। নিজের চাচাতো বোনের হাতে হাত রেখেছে কালু ! যে করেই হোক ওকে শাস্তি পেতেই হবে, ববির এই প্রতিজ্ঞা। দিনটাও পেয়ে যায়। সাথে ববির আরও সহযোগি ছিল।
      এক বিপদের ওপর আরেক বিপদ। কিছুক্ষণ আগেই বিদেশ থেকে খবর এসেছে খলিল মিয়ার অবস্থা খারাপ। তিনি অসর্তকতায় উপর দিকে তাঁকিয়ে কাজ করতেই পা ফসকে এক কুপে পড়ে যান। অনেক্ষণ পরে তাঁকে তুলতেই দেখে অর্ধেক মৃত হয়ে গেছে। প্রয়োজনিয় অক্সিজেনের অভাব ছিল কুপে। হাসপাতালে ভর্তি আছেন। বলা যায় না কী হবে !
      কালুও হাসপাতাল বেডে শুয়ে আছে, সাথে মা ও বোন। অতিরিক্ত রক্ত ক্ষরণে শরীরটা সাদাটে হয়ে গেছে। ইতিমধ্যে এক ব্যাগ রক্তও দেওয়া হয়েছে। বাপের খবর কালুকে জানানো হয়নি। শুধু বছিরন বিবি ও বীণা তা ভেবে আড়ালে চোখের জল ফেলছে।
      পরিবার থেকে সকল স্বপ্ন ধুয়ে মুছে গেল। ক’দিন আগেও স্বপ্নের সাঁকো সচল ছিল, পরিবারে সুখ ছিল। কালু নেই, তার বাপও নেই। বছিরন বিবি এক গভীর জলে পড়ে হাবুডুবু করছে, কোন ঠিক ঠিকানা নেই।
বীণার বয়স হয়েছে। টাকার অভাবে বিয়ে দিতে পারছেন না মা। অনেক ঘটকের কাছে বলে রাখলেও লাভ হচ্ছে না। মা মেয়ে শুয়ে আছে। ঘরের বেড়া পাট খড়ি দিয়ে বাঁধা। রাতে বেড়ায় মাঝে মাঝে খটখচ শব্দ করে। মায়ের মন চমকে উঠে। ঘরে যুবতি মেয়ে, কে না আবার কোন চিন্তায় কী করে ! নিজের চিন্তা তিনি করেন না, মেয়েটোকে বিয়ে দিতে পারলেই সকল পাওয়া হবে।
     বাড়িতে অনেক মানুষের ভীড়। এক সাথে মা ও মেয়ের জানাযার হবে। গত রাতেই ঘটনাটা হয়েছে। ছিল ঝড়ের রাত। চিৎকার করলেও বেশী দূরে শব্দ যায়নি। এসেছিল বীণাকে তুলে নিতে, তাতে বছিরন বিবি বাধা দেওয়ায় তাঁকেও মরতে হল।
       কেউ নেই সংসারে। কে মামলা করবে? সরকার বাদী হয়ে করবে? কোন ফায়দা নেই। কয়েকবার হাজিরা চলবে আসামীদের, তারপর সব ঠিকঠাক হয়ে যাবে। একটা পরিবার ধ্বংশ হল। সেই সংসারের কটা মানুষের স্বপ্ন আশা চুরমার হয়ে গেল।
                                                               সমাপ্ত





একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

[blogger]

sislam8405

{Facebook#https://www.facebook.com}

যোগাযোগ ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

luoman থেকে নেওয়া থিমের ছবিগুলি. Blogger দ্বারা পরিচালিত.
Javascript DisablePlease Enable Javascript To See All Widget