Articles by "গল্প"

কবি ও কবিতা
 শানপুর ওভার ব্রিজের ওপর দক্ষিণমুখি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বাতেন ভাই। পাশ দিয়ে হাজারো মানুষ চলাচল করছে। কেউ জানতে চাচ্ছে না, সে এখানে এতোক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছে কেন? এই শহরটা বড় নিষ্ঠুর, আরও নিষ্ঠুর শহরের মানুষগুলো। রাতের ড্রিম লাইটের আলোর মত মানুষগুলোর মনও ফেকাশে হয়ে গেছে। চারদিকে মানুষ আর মানুষ। মায়া দয়া বিহীন মানুষের ভীড়ে একজন মানুষ ওভার ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে কী চিন্তা করছে, তা কারোর দেখার কথা নয়।
    আকাশে মেঘের কোন ছায়াও নেই। অথচ হঠাৎ করেই ক-পশলা বৃষ্টি নেমে গেল। পথের ধূলি বাতাসে উড়ে পরিবেশটাকে একবারে জগা-খিচুড়ি করেছিল। পথে চলতে গেলে নাকে মুখে আলাদা কাপড়ের টুকরো চেপে ধরতে হয়। কখনো আবার দিনের বেলায় দাউ দাউ আগুনের ফুলকির মত রোদ ওঠে। এই রোদের মধ্যে বিভিন্ন পেশাজীবি মানুষেরা ছুঁটেছে তাদের নিজেদের কাজে।
    ভোর থেকে ছুঁটে চলছে কম বয়সের অনেক হকাররা। এক গাদা পত্রিকার বান্ডেল নিয়ে এক গাড়ি থেকে আরেক গাড়িতে। অথচ ওই পত্রিকার ওজনের সমানও ছেলেগুলোর ওজন হবে না। জীবনের তাগিদে সবাই ছুঁটছে এক জায়গা থেকে অন্যত্র।
    শানপুর, রাজধানি মতিহারের এক মাত্র বাটপাইয়া এলাকা। এখানে ঘটেনা এমন কোন কাজ নেই। চুরি ডাকাতি ছিনতাই পকেটমার মলমপার্টি থেকে শুরু করে নারী বিষয়ক কাজ। অথচ এখানেই দেশের সব চেয়ে বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো। আছে ইঞ্জিনিয়ারিং, মেডিকেল, কারিগরি প্রশিক্ষণ ভিক্তিক বিভিন্ন কলেজ। একদিন এখানের কোন অফিস বন্ধ থাকলে দেশের জন্য অশূভ হয়। এখানে আছে রাজধানির সব চেয়ে বড় কাঁচা বাজার। আছে হোটেল, রেষ্টুরেন্ট, আবাসিক এলাকা।
    এই ব্রিজের ওপর থেকে বাটপাররা মানুষদেরকে টার্গেট করে, কাজ হাছিল করে। কোন লোকেগুলো রাজধানিতে পুরানো ও নতুন আমদানি। ওদের মূল টার্গেট থাকে গ্রাম থেকে আসা লোকদের ওপর। পথে হাঁটার ভাব দেখেই ওরা গ্রামের লোকদেরকে চিনতে পারে।
    বাতেন ভাইও গ্রামের সন্তান। সেই বারো বছর আগে এই শহরে সে এসেছে। কোন এক কাক ডাকা ভোরে বাতেনের শানপুরে পা রাখা। প্রথমেই সে হোঁচট খায়। দূর পাল্লার গাড়িতে করে বাতেন নেমেই একটু প্রকৃতির টানে কাজ সেরে পেছন ফিরে দেখে তার ব্যাগটা নেই। বাতেন হাউ মাউ করে কাঁদতে থাকে। ওখানে তেমন বেশী টাকা পয়সা না থাকলেও দামি জিনিস ছিল।
    বাতেন ব্যাগ রাখা ওই জায়গাটাতে অপলক দৃষ্টিতে অনেকক্ষণ ধরে তাঁকিয়ে থাকে। বেলা বাড়তে থাকে। বাতেন সেখানে থেকে সরে না। ভাবে, কেউ যদি ভুলে নিয়ে থেকে আবার ফেরত দিতে আসে, সেই আশায়। শানপুরে পাওয়া বলতে কোন হিসেব নেই, শূধু হারানোর পালা।
    অনেক স্বপ্ন নিয়ে বাতেন এই শহরে আসে। বাবা-মা হীন এক মাত্র বোনকে বিয়ে দেওয়ার জন্য টাকা কামাই করতে হবে। বাতেন ব্যাগের আশা বাদ দিয়ে দু-হাত দিয়ে চোখ ঘসে চারদিকে তাঁকিয়ে অবশেষে ওপরে তাঁকিয়ে কি যেন ভাবে। বিদুৎ এর তারের ওপর সকাল সকাল কাকের মেলা বসেছে। একটা বাদুরের দেহ তারের সাথে লেগে থাকতে দেখা গেল। বাদুর চোখে দেখে না। কিন্তু কানে শুনার ক্ষমতা তুখোড়। অতি ক্ষুদ্র শব্দও শুনতে পারে। বাদুর শব্দ তরঙ্গ ব্যবহার করে চলার পথের দিক নির্ধারন করে পথ চলে। হঠাৎ করেই একটা কাকের পাছার মাল বাতেনের কাঁধে পড়ে। বাম হাত দিয়ে নাকে নেওয়ার আগেই ঘটনা বুঝতে পারে।
    পেটে বাতেনের ক্ষুধা। এমন সময় এই কাজ কাকের ! বাতেন রাগে বলল, শালার কাকের বাচ্চা কাক আর বুঝি জায়গা পেলিনা !  কয়েকজন কাগজ কুড়ানো পোলাপান ওর পাশ দিয়ে পেছনে ছেঁড়া ছালা নিয়ে যাচ্ছে আর বলছে, "আজ হিসেবের খাতায় ভাগটা ভালোই পাবো রে, তাই না?"
    আরেকজন বলছে, "ঠিক তাই। সু-সময় সব সময় আসেনা। কিন্তু ওই লোকের জন্য আমার খুব মায়া হচ্ছে রে। কি সুন্দর সার্ট ও প্যান্ট পড়া ছিল, তার পেটে মেরে দিলাম ছোরা, পেয়ে গেলাম লাখখানি টাকা। লোকটা মনে হয় শানপুর এসেছিল কোন চাকরির খুঁজে ঘুস দিতে। তাছাড়া মনে হয়না তিনি এখানের স'ায়ী বাসিন্দা।"
    বাতেন, বাম হাতে লাগা কাকের মাল একটা দেয়ালে মুছে ওদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছে। কাছে কোন জলের ব্যবস্থা না থাকায় দেয়ালে মোছা। সৃর্যের তাপটা বেড়ে যাচ্ছে, সাথে পেটের ক্ষুধা। খাবার হোটেলে ভিড়। বেশীর ভাগ লোকেরই নাস্তার উপকরণ রুনটি ও ভাজি। কেউবা সাথে ডিমের ওমলেট।
    কাগজ কুড়ানো ছেলেদের দিকে আর নজর না রেখে বাতেন এক হোটেলের কাছে দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। পকেটে কোন টাকা নেই। যে ক’টা ছিল তা ব্যাগে ছিল। হোটেলের ক্যাশিয়ার বাতেনের কাছে তার চাচার মত দেখতে। মাথার সামনে কোন চুল নেই, নাকটা লম্বাটে দেহটা মধ্যম ধাচের। একের পর এক লোকজন খেয়ে যাচ্ছে। অনেকেরই খেয়েও কিছু ফেলে যাচ্ছে, সেগুলোও যদি বাতেন খেতে পারে ক্ষুধা থাকবে না। তবে বাতেন ওগুলো খাবেনা। সে তো ফুটপাতের টোকাই না। ব্যাগটা চুরি হওয়ার কারণে বাড়ি থেকে আনা খাবার...।
    বাতেনের জিহ্বা্‌ দিয়ে জল পড়ছে। ক্ষুধার কারণে চোখে মুখের জল শুকিয়ে গেছে। করুণ দৃষ্টিতে ক্যাশিয়ারে দিকে তাঁকিয়ে আছে সে, যাতে তিনি ওর দিকে তাঁকায় কিনা দেখতে। একটা পাঁচশত টাকা নোট আলোতে নিয়ে দেখতে গিয়েই ক্যাশিয়ারে নজরে পড়ে বাতেন। বলে, এই ছোকরা, ওমন কুকুরের মত হা করে আছিন কেন? এই টাকা ছিনিয়ে নিবি নাাকি?
    বাতেন মাথা নাড়ে, "না।"

    বলতে চায়, "একটা রুটি...!"
    ক্যাশিয়ার তাঁদের লোকগুলোকে বলল, ধর এই ছিনতাইকারিকে। আমার পাঁচশত টাকা ছিনতাই করতে চাচ্ছে। 
    বাতেন তখনও বলছে, "না, না। শুধু একটা রুটি... চাচা?"
    লোকগুরো তেড়ে আসতেই ক্যাশিয়ার তাদেরকে হাত দিয়ে আঁটকে বলল, "কে তোর চাচা? আমার তো কোন নিদিষ্ট মা বাপই নেই। কার গর্ভে জন্ম তাই তো জানিনা। তুই আবার ভাতিজা হলি কবে? শালার বেটা আমাকে ভুলাতে চাচ্ছিস না? এ খাড়া দেখাচ্ছি মজা।"
    বাতেন তখনও বলে যাচ্ছে, "একটা রুটি..., চাচা?"

    বাতেন যখন নিজেকে সৃষ্টি করল তখন সে একটা ময়লার স্তূপের কাছে পড়ে আছে । নাকে যেন হঠাৎ করেই গন্ধ ঢুকলো। অচেতন থাকলে নাকে গন্ধ যায় না ! পঁচা সবজির গন্ধ, ডিমেরর গন্ধ, ফুটপাতে বড় হওয়া মানুষের গুয়ের গন্ধ, পথ দিয়ে হাঁটা সবার পেচ্ছাবের গন্ধ। বাড়ি থেকে পড়ে আসা বোনের ধোয়া দেওয়া সার্ট প্যান্টের অবস্থা আর আগের মত নেই।
    বাতেনের চোখ দিয়ে টপাটপ জল পড়ছে। যে আশা নিয়ে সে এই শহরে এসেছে তার যে কতটা পূরণ করতে পারবে তা ভেবে বাতেন আরও কাঁদতে থাকে। যে করেই হোক সাফল্য তাকে পেতেই হবে। একমাত্র বড় বোনকে বাতেন বিয়ে না দিয়ে বুড়ো হতে দিতে পারে না। বাতেনের চোখের সামনে ভাসছে, তার বোন বিয়ের আসরে বসে আসে। সাথে বোন জামাই। বাতেন আজ মহাখুশি। জীবনের একটা শ্রেষ্ট চাওয়া পূরণ হল। তাই স্রষ্টার দরবারে দোয়া করছে।
    হঠাৎ কুকুরের ঘেউ ঘেউয়ে বাতেনের ধ্যান ভেঙে যায়।। ওরা এখন ওই ময়লা থেকে খাবার বের করে খাবে তাই কাছে অন্য জাতির উপস্থিতি কামনা করছে না। সাদা কালো নীলসহ পাঁচ সাতটা কুকুর বাতেনের দিকে তঁকিয়ে আছে। হয়তো ভাবছে শালার  মানুষ তোরাও এখন আমাদের খাবারে ভাগ বসিয়েছিস? একটা কুকুর তার লেজ ঘুরিয়ে তেজী ভাব দেখাচ্ছে। মনে হয় বাতেনের উপর হামলা করবে খাবারে ভাগ বসানোর অপরাধে।
    বাতেন আর কিছু না ভেবে অন্য দিকে চলে গেল। এই শহরে কেউ তার আপন বলতে নেই। ঠিক ক্ষুধার সময় যদি খাওয়া না যায় তবে পরে আর তা থাকে না। বাতেনের অবস্থা হয়েছে তেমন। ইহা আর কতক্ষণ থাকবে ! খেতে তো হবেই। বাতেন ভাবছে, টাকা কামাই করি আর নাই করি আগে নিজের জীবন বাঁচাতে হবে। জীবনই যদি না বাঁচে তবে টাকা কামাই করে বোনকে বিয়ে দেওয়া হবে না। এভাবে না খেয়ে মরা যাবেনা। কিন্তু কী করা যায় ! যাই করতে যাই না কেন তার জন্য পুঁজির দরকার। তা কোখায পাবো ! না পাওয়ার আশাই বেশী। করতে হবে চুরি, করতে হবে ডাকাতি, করতে হবে ছিনতাই। জীবনের ছিনতাই্‌ করিনি, ছিনতাই না করেই গণ পিটুনি খেয়ে ময়লার ওপর এক রাত থাকতে হয়েছে আমাকে। তাহলে সেই ছিনতাইকারিই হবো আমি। এলাকার সেরা ছিনতাইকারি, সেরা বাটপার, সেরা সন্ত্রাসী।
    নিজের মাঝে নিজেকে তেজী ভাব দেখাতে গিয়েও পেলো না বাতেন। একটা কিছু দিয়ে পেটটা ভরানো চাই। কি খাবো, মানুষ হয়ে তো ঘাস গোবর লতা পাতা খেতে পারিনা !
    সন্ধা হয়ে আসছে দুপুরে একটা অর্ধ খাওয়া রুটি জোটেছিল। একটা মেয়ে খাইতেছিল, তা চাইতেই মেয়েটা দিযে দেয়। মায়াহীন মানুষের ভিড়ের ক’জন মায়ার মানুষ এই দুনিয়ায় এই শহরে আছে। ওই তো এক অর্ধ বুড়ো লোক হাতে করে কি যেন নিয়ে যাচ্ছে। খাওয়ার জিনিসই হবে মনে হচ্ছে। ডান পাশে একটা গলি আছে, ছিনতাই করে ওদিকে দৌড় দিবে বাতেন ভাবছে। আর ওই বুড়োর কাছ থেকে জিনিস নিতে আবার দৌড় দিতে হবে ! একটা ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিবে ।
    বুড়ো একটা হালকা চিৎকার করলেন। ক’জন মানুষ আসতে চেয়েও এলোনা। এই শহরে সবাই নিজের জন্য ব্যাস্ত। কোথায় কে ছোরার আঘাত খেলো না খেলো তা নিয়ে কারোর মাথা ব্যাথা নেই। না ! বুড়ো তাঁর পুটলায় ভালোই কিছু রেখেছেন। সবই খাবার জিনিস। একটা ছোট বাক্সের ভিতরে কিছু আছে বলে মনে হচ্ছে। কয়েকটা বাঁধ দেওয়া তাতে। বাতেন তা খুলে দেখল। একটা কাঠের তৈরি পুতুল। হয়তো বুড়ো তাঁর ছোট কোন নাতি নাতনিকে দিতে কিনেছিল।
    বাতেনের মনটা খারাপ হয়ে গেল। ছিনতাইকারিদের মন তো খারাপ হওয়ার কথা নয়। ক্ষণিকেই মনটা ছোট বাচ্চাদের মত হয়ে গেল। যা-ই হোক, বাতেন খেয়ে পেটটা ঠান্ডা করে নিল। আজ রাত থেকেই বাতেন তার মূল পরিকল্পনায় কাজ শুরু করবে। কী দিয়ে শুরম্ন করা যায় তাই ভাবে।
    দুদিনে হয়ে গেল শানপুরের অলিগলি ঘুরেও কোন বড় সুযোগ পাওয়া গেল না। । তবে পেটের ক্ষুধা মেটানোর জন্য খাবার খুব সহজেই জোটে যাচ্ছে। সামান্য কষ্ট করে একটা ছোরা দেখাতে পারলেই টাকা পয়সা ঘড়ি মোবাইল পাওয়া যাচ্ছে। ঘড়িটা বেশী পাওয়া যায় না তার পরিবর্তে মোবাইল। বাতেন একটা সিম কিনে মোবাইল ব্যবহার করা শুরু করে। ছিনতাই করা মোবাইল।
    ইতিমধ্যে ছোট দেখে একটা বাসা বাড়া নেয় বাতেন। যে এলাকায় থাকে তার আশেপাশে বাতেন কোন খারাপ কাজ ভুলেও করে না। সবই হয় অন্য এলাকায়। কখনো প্যান্ট সার্ট পড়ে শিক্ষিত মানুষ কখনো তালি দেওয়াটা পড়ে বখাটে স্টাইল। আবার কখনো একদম নোংরা কাপড় পড়ে বস্তির অনাহারি মানুষ। সব দিকেই তার লাভের অংকটা হিসেবে থাকে।
    ক্রমেই বাতেন একটা পর্যায়ে চলে আসে। নামের মধ্যে পদ্দতি করে ফেলে। মানে ভাই যোগ করে নেয়। বাতেন ভাই নাম শুনলেই তাদের চেলাপেলারা কাঁপতে থাকে। বাতেনের সব চেয়ে বড় গুন্ডামির পরিচয় হল সে চোখের পলকে বুদ্ধি বের করে দুই নাম্বারি কাজ করতে পারে। ছোরা চালাতে পারে। রক্ত দেখে আগে ভয় পেলেও এখন তা না দেখলে মাথাটা খারাপ হয়ে যায়।
    একটা সময় এমন হল বাতেনের, তাকে আর কোন কাজে যেতে হয় না। শুধু হুকুম করে। সেই বারো বছর বয়সে শানপুরে আসা বাতেন আর বর্তমান বাতেন অনেক আলাদা। এর মাঝে গ্রামে গিয়ে বাতেন বোনটাকে বিয়ে দিয়েছে। যে আশায় তার সকল গুন্ডামি কাজ শুরু। সেই বোনকে বিয়ে দিয়েও তা পূরণ হয়নি। বোনের জামাই অকারণেই বোনকে মারত। বিড়ির আগুন বোনের শরীরে ধরে থাকতো। বুকের কাপড় খুঁলে স্তনের বোটায় জ্বলন্ত বিড়ি ধরিয়ে তা জখম করে দিতো।
    বাতেন বোনের কাছে গেলেও ওই সব কথা বোন বলত না । একদিন ভাইকে খেতে দেওয়ার সময় বোন নিজের বুকের মাঝে হাত রেখে উহ্‌ শব্দ করে। বাতেন বলে আপা তোর বুকে কী হয়েছে রে?
    বড় বোন মায়ের মত, মায়ের বুকে সন্তান খারাপ চোখে তাঁকাতে পারেনা। খাওয়ার থালা সরিয়ে দিয়ে বাতেন বোনের বুকের কাপড় টান দিযে খুঁলে দেখে জায়গা পোড়ে জখম হয়ে গেছে। আর বুঝতে বাদ রইল না, কে করেছে। খাওয়া থেকে ওঠে বলল, "শুয়রের বাচ্চা কোথায়? "
    বোন জামাই কোথা থেকে যেন দুলতে দুলতে বাড়িতে আসে। সে কিছু না বুঝতেই বাতেন তার বাম হাতের একটা আঙ্গুল ছোরা দিয়ে কেটে ফেলে বলে, "হারামি বাচ্চা হারামি আমার বোনের শরীরে হাত? গরিব হয়েছি বলে বোনকে যা তা অত্যাচার করবি? বোনের জামাই বলে পুরো হাতটা কাটলাম না। আর যদি একদিন শুনি আপার গায়ে একটা আঁচড় তো দুরের কথা একটা খারাপ কথা বলেছিস। তখন তোকে বোনের জামাই বলে ছেড়ে দেবো না। একেবারে কাল্লাকাইটা ফালামু।"
    বাতেন বাড়ি থেকে চলে যায়। যাওয়া আগে বোনকে বলে দুলা ভাইয়ের হাতটা একটা কাপড় দিয়ে বেঁধে দিস।
    বাতেন ভাই ব্রিজের ওপর থেকে নেমে দৌড়ে কোন দিকে যেন যাচ্ছে। পেছন থেকে কে যেন ডাকছে। এতো রাতে আবার কে ডাকে? বাতেন ভাই পেছনে না তাঁকিয়ে দাঁড়ায়, কণ্ঠটা পরিচিত মনে হচ্ছে। 
    সোনালি তুমি এখানে?
    হ, বাতেন ভাই। আমার বাবার অবস্থা খুবই খারাপ। এক ছিনতাইকারির ছোরায় এখন আহত। তুমি তো জানই ওই দিকে কে কাজ করে। তাহলে খবর নেও। হবু শ্বশুরে জন্য কিছু একটা করো।
    সেই বারো বছর আগে এক সকালে মাত্র একটা রুটি খেতে চেয়ে তার বদলে গণ পিটুনির শিকার হয় বাতেন যার হুকুমে, সেই লোকই সোনালির বাবা। বাতেন এ কথা স্বরণে রাখলেও সোনালি তা জানে না। তাই শ্বশুরের প্রতি বাতেন তেমনটা আগ্রহী নয়। রাত বাড়ার সাথে ব্রিজের ওপরে চলাচলের লোকের সংখ্যাও ক্রমেই কমে যাচ্ছে। যারা আছে, তাদের অনেকেই মুক্ত দোকানদার।
    বাতেন বলল, আমি তো ক’দিন ধরেই ওই কাজ ছেড়ে দিয়েছি। ওই পথে আর পা বাড়ানোর ইচ্ছে নেই। চলো তোমার বাবাকে বাঁচাতে হলে হাসপাতালে নিতে হবে।
    ছোরার আঘাতটা পেটের ডান দিক বরাবর ঢুকেছে। হাসপাতাল বেডে ক্যাশিয়ার সাহেব বাতেনের হাত ধরে বলেন, "তুমি সেদিন কিন্তু আমাকে চাচা বলেছিলে। আজ যেন তা সত্যি হল। তোমার হাতে আমি সোনালিকে দিয়ে গেলাম। সে তোমার দুই সম্পর্কের একজন। এক. চাচাতো বোন. দুই. বউ।" বাপের যাবার বেলায় হঠাৎ করেই সোনালির চোখে মুখে বিয়ের বাতাস লাগতে থাকে। ক্ষণিকেই দক্ষিণা বাতাস তার মনের উথালে সৌরভ দিয়ে গেল।
    সোনালিকে নিয়ে বাতেন ভাই নিজের গ্রামের বাড়িতে যায়। এক মাত্র বোনকে ছাড়া বাতেনের জীবনে কিছু নেই। বাতেনের বাড়িতে অনেক লোকের জটলা। বুকের মাঝে যেন একটা কাঁপুনি হল। ভীড় মারিয়ে যেতেই দেখে, বোনের লাশ। লোকদের কাছ থেকে জানতে পারে। গত রাতেই ফাঁস দিয়ে মারা যায়। আজ লাশ বাপের  বাড়িতে পাঠায় তার স্বামী।
    বাতেনের বিশ্বাস তার বোন ভাইকে একা ফেলে যেতে পারেনা। বোন জামাই যে হারামি, তাকেই বাতেন সন্দেহ করল। আর কিছু না বলে বোন জামাই বাড়ির দিকে যেতে থাকে।
    সোনালি বাধা দিয়ে বলে, এই সময় মাথা ঠিক রাখতে হবে। আগে বোনের লাশ কবর দেওয়ার ব্যবস্থা করো তারপর দেখা যাবে।
    ভালো হতে চেয়েও বাতেন ভালো থাকতে পারছেনা। বোন জামাইকে শেষ করে দিয়ে সব খান্ত দিতে হবে। ছোরা হাতে বাতেন দৌড়াতে থাকে।    
    সোনালি বলে, আর নয় খুন খারাপি আর নয় খারাপ কাজ, তাকে মারলেই কি তুমি তোমার বোনকে ফিরে পাবে? বরং জেল জরিমানা নয়তো ফাঁসিও হতে পারে। তার চেয়ে তাকে পুলিশের কাছে ধরিয়ে দাও। আইনই তার সঠিক বিচার করবে।
    বাতেন সোনালির কথা ফেলতে পারে না। কেঁদে বলে, বোনটা কি কবরে গিয়ে আমায় বলবেনা, প্রতিশোধ নিতে পারলিনা ভাই?
    সোনালি নিজের হাতটা বাতেনের মাথায় রেখে বলল, কিচ্ছু বলবে না। চলো এখন যা কাজ তাই গিয়ে করি।                          
                                                            সমাপ্ত                             
কবি ও লেখক
সাইফুল ইসলাম
৩০-০৭-২০১২

                                                              
কবি ও কবিতা
      
     দোকাদারের কাছে এক হালি ডিম কিনতে গেছে ফজলুল হক ওরফে ফজু। বয়স ছয় কি সাত হবে। মুখে কোন গোফ দাড়ির বালাই নেই। নাপিতের কাছে গিয়ে মাঝে মাঝে চাচা  ডাক দিয়ে বলে, একটু এই দিকে টান দিয়ে দেওয়া যায় বেস্নড দিয়ে?
    নাপিত সাহেব ফজুর দিকে তাঁকিয়ে থেকে বলেন, বয়স কত হল তোমার?
    বয়সের সাথে গোফ দাড়িতে ব্লেড ধরার কী সম্পর্ক আছে?
    কোন কথায়ই যখন কাজ হয় না তখন একটু দূরেই দেখতে পায় তার বাপ আসছে নাপিতকে চুল কাটার বিল দিতে। ফজু চুপ করে বলে, ঠিক আছে ভালো করে চুল কাটেন। ওসব কথা এখন বাদ।
    নখ কাটার কথা বলে অন্য দোকানদারের কাছ থেকে একটা ব্লেড কিনে নিয়ে বাড়িতে বাথরুমে ঢুকে গোফ দাড়ি কাটতে থাকে। দু-টান না দিতেই উহ্‌ বলে মৃদূ চিৎকার করে।
    বাহির থেকে ওর মা বলেন, কিরে ফজু ভিতরে কি করছিস?
    না মা কিছু হয়নি। পিঁপড়ায় কামড় দিয়েছে।
    তুই বুঝি ওখানে গিয়ে গুড় খাচ্ছিস? গুড়ের প্রতি পিঁপড়ার বেশী আর্কষণ থাকে।
    মা চুপ থেকে অন্য কাজে চলে যান। বাথরুমে থেকে বের হয়ে আসে ফজু। গোফের এক দিকে কাটা দাগ। রক্ত বের হচ্ছে। খাওয়ার সময় মা বলেন, ওখানে বুঝি পিঁপড়ায় কামড় দিয়েছে রে?
    ফজু মাথা নাড়ে, হ্যাঁ।
    দোকানদার চারটা ডিম দিলেন। ডিম নিয়ে ফজু বাড়ির দিকে যাচ্ছে আর ভাবছে, এতোটুকু মুরগি ! আর সে ডিম পাড়ে কত বড় বড় ! কিন্তু কীভাবে সম্ভব। এই গোপন রহস্য এখন বাড়িতেই গিয়ে মুরগি হাতে নিয়ে দেখতে হবে। এ সব কথা ভেবে ফজুর মনে কিছু সৃষ্টির আকাঙ্খা হল। মায়ের কাছে কেনা ডিম দিয়ে ঘরে থাকা একটা খাঁচায় ভাত দিয়ে উঠোনে ডিম পাড়া মুরগিদেরকে ডাকছে।
    মা বলছেন, মুরগি ধরে কি করবি? গতকাল না এক মোরগ জবাই করে তার মাংস রান্না করে খাওয়ালাম।
    ফজু চুপ, আপন মনে মুরগিদেরকে ডাকছে। নাহ ! মুরগিরা খাঁচায় ধরা দিচ্ছে না। বাধ্য হয়ে ঘরের বেড়ায় আঁটকানো রাখা বরঁশিতে কেঁচো দিয়ে উঠোনে ফেলে রাখে । ব্যাস, মুরগি তা খেয়ে ফেলে। ফজু খুশিতে তা ধরে টেনে বরঁশি বের করতে চেষ্টা করে। চেষ্টায় সফল হল ঠিকই কিন্তু ততক্ষনে মুরগি আর নেই। মরা মুরগি হাতে নিয়ে বলছে, এই মুরগি এখন ডিম বের কর। আমি দেখবো কেমন করে অতবড় ডিম বের হয়।
    রান্না ঘর থেকে মা এসে ফজুকে একটা থাফড় মেরে বলল, এ তুই কি করলি? ডিম পাড়া মুরগিটাকে এমন ভাবে মারলি? খাড়া তোর ডিম নিয়ে গবেষণা দেখাচ্ছি।
    মায়ের হাতে দাদার হাঁটার ষ্টিলের লাঁঠি। মরা মুরগি ফেলে ফজু এক দৌড়ে বাড়ির দক্ষিণ দিকে পুকুর পাড়ে গিয়ে বসে ভাবে, মুরগিটা মারা গেল কেন? কোন সমাধান পেলো না। দুপুর হয়ে গেছে। লাঁঠির ভয়ে ফজু খেতেও যায়নি বাড়িতে। পেটটা ক্ষূধায় চোঁ চোঁ করছে।
    ফজুর মা বাবা দুপুরে খাওয়ার পর একটু ঘূমায়, তখন রান্না ঘরে কেউ যায় না। এই সময়টাকে কাজে লাগাতে হবে। ফজু নিজের ভাবনা মত এগিয়ে চলছে। মায়ের ঘরে দরজাটা অর্ধেক খোঁলা আছে। বারান্দায় একটা চেয়ার ও তার কাছে বাবার এক জোড়া জুতো আছে। মনে হচ্ছে কিছুক্ষণ আগে বাবা চেয়ার থেকে উঠে জুতো খূঁলে ঘরে গেছেন।
    ফজুর চোখ ঘরের দিকে তাঁকানো কিন্তু পাদ্বয় রান্না ঘরের দিকে যাচ্ছে। হঠাৎ রান্না ঘরের সামনের এক বদনার সাথে ফজুর পায়ের টক্কর লেগে বদনার পানি পড়ে গিয়ে একটু শব্দ হয়।
    ঘর থেকে মা বলেন, কে রে? ফজু? ফজু মুহূর্তেই ঘরের আড়ালে গিয়ে দাঁড়ায়। মা আরেকবার বললেন, এই ফজু? ভাত পাতিলেই আছে, থালাও ধোয়া আছে শুধু বেড়ে খেয়ে নি। আমার শরীরটা ভালো না।
    ফজু বুঝতে পারছেনা। মা তার ছায়াও দেখেনি, তাহলে ফজু নাম কেমনে বললেন?
    তিনি মা, পৃথিবীতে আপনজনের মধ্যে প্রথমের প্রথম। ফজু আর কিছু না ভেবে কিছুটা বেশী সাহস নিয়ে ঘরে ঢুকে খেতে থাকে। শব্দ হলেও কে কে বলে মা আর ডাকবেন না। রান্না হয়েছে ডিম। নাহ্‌ ডিম ফজু খাবেনা। যা নিয়ে গবেষণার পালায় ফেল তা খাওয়া যাবেনা। আর কি আছে ভেবে অন্য পাতিলে খূঁজতে থাকে। মুরগির তরকারি, টুকরার মধ্যে আছে দুটো পা, গলা ও গিলা(যার মধ্যে পরিপাককৃত খাদ্যের অপ্রয়োজনিয় অংশ থাকে)। গলা খাওয়া গেলেও পা ও গিলার কথা ভাবতেই কেমন যেন বমির ভাব হল ফজুর। নাহ্‌ এসব দিয়ে ফজুর খাওয়া হবে না। কিন্তু ক্ষূধার কি হবে? পেট বলছে খাবো কিন্তু মুখ ?
    সব কথা বাদ দিয়ে হঠাৎ করেই গিলা দিয়ে মাখানো দুটো ভাত ফজু মুখে পুরে দেয়। কই ! তেমন খারাপ তো লাগছে না। ফজু খাবার খাচ্ছে। খাওয়ার ফাঁকে দুই দুইটা মুরগি রান্না ঘরে গিয়েছিল খাবারের আশায়। ফজু ধরতে গিয়েও বাধার মুখে পড়ে মায়ের সেই ষ্টিলের লাঁঠির কথা মনে করে। ভাবে নাহ্‌, কোন ভাবেই মায়ের হাতে দাদার ওই ষ্টিলের লাঁঠির মার খাওয়া যাবে না। বন্ধুরা কেউ যদি শুনে তবে স্কুলে গেলে মুখ দেখানো যাবেনা। তারাতারি খেয়ে খাল থেকে কিছু মাছ ধরে নিয়ে আসি। মা তাতে খুশিই হবেন, সকালে মারা মুরগিটার কথা আর মনে রাখবেনা। কিন্তু' টেংরা ও শিং মাছেরা যে হুল ফোটায়, তাতে বিষণ ব্যাথা করে। তাহলে কি করা যায়? কি করলে মাকে শান্তনা দেওয়া যায়? এসব কথা ভাবতে ভাবতে ধ্যানে পড়ে খাওয়া শেষ না করেই।
    ও দিকে থালার ভাত সব সেই দুটো মুরগি সাবাড় করছে। মায়ের ডাকে ফজুর ধ্যান ভাঙে। দেখে থালায় ভাত নেই। পাশেই মুরগি দুটো আরামে বসে ঘূমাচ্ছে। রাগে ফজু লাঁঠি দিয়ে মুরগিদের প্রতি তাড়া করতেই দুয়ারে ফেলা পানিতে পা পিছলে পড়ে গিয়ে দরজার সাথে আঘাত খেয়ে মা গো বলে চিৎকার করে। কপালে বেয়ে রক্ত বের হয়।
    মা বললেন কি হয়েছে রে ফজু?
    না মা, কিছু না। মুরগি দুটো যন্ত্রনা করছে তো তাই।
    ফজুর পেট ভরেনি খাবারে। পাতিলেও ভাত নেই। দুঃখে ফজু নিজের গালে হাত রেখে বসে ভাবছে। আজকের দিনটাই শালার ডিম ও মুরগি নিয়ে ভেবে গোল্লায় গেল।
                                                            সমাপ্ত
                                                                                            ০৬-০৮-২০১২


    গত তিন দিন ধরে বশির স্কুলে যায় না। আমেনা বেগমও ওকে স্কুলে যেতে তাগিদ দেন না। বশির উঁচু টিবির ওপর একা বসে কী যেন ভাবছে। ওখানে সে প্রায়ই বসে থাকে। আমেনা বেগম সকাল থেকে বশিরকে খুঁজছে। না খেয়ে ছেলেটা কোথায় গেল ! বশির মা মা ডাক দিয়ে এসে বলল, খেতে দাও খুব ক্ষুধা পেয়েছে। বশির খাবার খাচ্ছে ও বলছে, জানো মা আজ আমার মনটা খুব ভাল লাগছে। তোমার মুখ পানে চেয়ে থাকতে ইচ্ছে করছে, কত যেন মায়া ওতে লেগে আছে। 
তোর মুখে এই সব কথা আগে তো কভু শুনিনি। আজ কি হয়েছে রে তোর?
একটু আগে একজন বুড়ো মহিলার সাথে দেখা ও কথা হল, তিনি আমাকে ইংগিত করে বললেন। আমার ছেলে যদি থাকতো তাহলে তোমার মত এত বড় হতো, আমাকে ভিক্ষা করতে দিত না। আমি বললাম সে কোথায় থাকে? তিনি বললেন হারিয়ে গেছে, জানি না কোথায় আছে। কত পথ প্রান্তরে খোঁজা খুঁজি করেছি পাইনি তবে মনে বিশ্বাস আছে বাজানরে আমার বুকে ফিরে পাবো। আমি বললাম, আপনার ছেলেকে এতো দিনে দেখলে চিনবেন? তিনি বললেন, চিনবোনা মানে সে তো তোমার মত।
আমেনা বেগমের চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। বশির না দেখার আগেই তা নিজের কাপড়ের আঁচল দিয়ে মুছে নিলেন। বাবলু বাড়িতে নেই। আজ বাড়ি ফিরবে। তার এক বন্ধুর বিয়েতে গেছে। বশিরকে যেতে বলেছিল, যায় নি। বশির খাওয়া শেষ করে তার নিজের ঘরে চলে গেল। আমেনা বেগম আর খেতে পারলেন না। বুকটা কেমন যেন করছে ! মায়ের মনে সন্দেহ, ছেলেকে হারানোর ভয় জেগেছে।
আমেনা বেগম জানেন বশির তার পেটে ধরা সন্তান নয়, নিজের সন্তান না হলেও এতোটুকু অবহেলা কিংবা বকাঝকা করেননি বশিরকে, যেটুকু বাবলুকে করেছেন।
আমেনা বেগমের মনে শান্তি নেই। তাঁর ভাবনা শুধু বশিরকে নিয়ে, ও যদি জানতে চায় যে, সে নিজে দুই বছর আগে কোথায় ছিল ! তখন উত্তর দিব ! তিনি নিজেকে অনেকবার প্রশ্ন করলেন তাতে কোন সমাধান খুঁজে পেলেন না। শুধু বুকটা হাহাকার করছে। বশিরকে পেটে ধরা ছাড়া আর কী করিনি ! খাওয়ার পর নিজের আঁচল দিয়ে মুখ মুছে দিয়েছি, কোন অসুখ হলে সারারাত জেগে সেবা করেছি, এই বলে আমেনা বেগম আত্মনাদ করছেন। গত দুই বছরের সব স্মৃতি আমেনা বেগমকে তাড়া করছে।
পাশের ঘর থেকে বশির এসে বলল, মা একটা কথা বলব?
আমেনা বেগমের বুকটা নাড়া দিয়ে উঠলো। আঁচল দিয়ে চোখ মুছে জানতে চাইলেন কি বলবি বাবা বল?
মা তোমার যদি আপত্তি না থাকে তাহলে আমরা তিনজন একত্রে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে বেড়াতে যেতে চাই। শুনেছি জায়গাটা খুব সুন্দর। সাগরের ঢেউ, সূর্য ডুবার দৃশ্য, জোয়ার ভাটা আর কত কী !
ঠিক আছে তাহলে আমরা আগামীকাল রাত দশটার ট্রেনে রওনা হবো।
বাবলু তো খুশিতে আত্মহারা, এই প্রথম সমুদ্রের ঢেউ দেখবে, শামুকের মালা, লোনা পানি ইত্যাদি। আমেনা বেগমের যাওয়ার তেমন কোন ইচ্ছা ছিল না, তবুও বশির যেহেতু ইচ্ছা প্রকাশ করেছে সেই কারণে যাওয়া।
শীতকাল। কাপড় চোপর নিয়ে রাত দশটার ট্রেনে রওনা হল। হিম বায়ুতে ট্রেন ঝনঝন শব্দে চলছে। বশিরের এই সময় কার কথা যেন মনে পড়ছে। কে যেন অনেক বার সমুদ্র সৈকত দেখতে যেতে চেয়েছিল কিন্তু আর যাওয়া হয়নি। তার নামটা মনে আসছেনা। আজ বশির যাচ্ছে হয়তো ভাল লাগবে না কিংবা লাগতেও পারে ! বিভিন্ন্ন কথা বশিরকে জড়িয়ে ধরলো।
ট্রেন স্টেশনে থেমেছে। ওরা তিনজন ট্রেন থেকে নেমে এক হোটেলে উঠলো। সকালের নান্তা শেষ করে বশিররা সমুদ্র তীরে গেল। কত হাজারে হাজার মানুষ এসেছে সমুদ্র তীরে তাদের আপন কাছের মানুষকে নিয়ে। কিন্তু বশির একাকি দাঁড়িয়ে ঢেউগুলোর দিকে তাঁকিয়ে আছে। যদিও ওর মা ও ভাই সাথে এসেছে তবুও ভালো লাগছেনা।
বশিরের মন আজ ঢেউগুলোর সাথে মিশে যেতে চায় দূর মহনায়, যেখানে শুধু প্রেমের বন্দর, নেই রিক্ততা, কোন হতাশা। কোন বিরহের সুর নেই। বশির একটি বড় পাথরের ওপর বসে আছে। হঠাৎ ভাবনায় একটি কবিতা লিখে ফেললো সমুদ্রের ঢেউকে উদ্দেশ্য করে---
ঢেউ তুমি ঢেউয়ের মত
                       আমার মত নও  তো,
 আমার মত আমার প্রিয়া 
                                                                              তুমি তা জানো তো ।
দুপুরের খাবার শেষ করে আবার সমুদ্রের ঢেউ দেখতে গেল ওরা। তারপর হিমছড়ি চললো। ঝরনার পাড়ে দাঁড়িয়ে বশির এক দৃষ্টিতে তাঁকিয়ে তার কলকল শব্দ শুনতে পেল।
সন্ধার আগে ওরা তিনজন হোটেলে ফিরলো। রাত নয়টার ট্রেনে ফিরতে হবে। যে সার্ট ও প্যান্ট পড়ে জলে নেমেছিল তা লোনায় দাগ হয়ে গেছে। সার্টের পকেটে লবন ভরে গেছে। কিছু হালকা খাবার খেয়ে নিল তিন জন। এই সমুদ্র সৈকত বিদায় দিয়ে বশিরের কিছুতেই যেতে মন চাইছে না। এই সৈকতের মাঝে বশির একজনকে খুঁজে পেয়েছিল অদৃশ্য আবেশে। কিছুটা সুখের পরশ উঁকি দিয়েছিল। এই সামান্য সময় বশিরের হৃদয়ে গাঁথা থাকবে।
জানালা বেয়ে বাহিরের দিকে তাঁকিয়ে আছে বশির। মনে হয় গাছপালা বাড়িঘর সব পিছনে পালিয়ে যাচ্ছে। বশিরের মনকে তা দোলা দিচ্ছে। আমেনা বেগম, বাবলু ও বশির একই লাইনের সিটে বসে আছে। এগারোটার দিকে বাবলু ও মা ঘুমিয়ে পড়েছে কিন্তু বশিরের চোখে ঘুম আসছে না। তার চোখে শুধু সমুদ্র সৈকতের ঢেউগুলো ভাসছে আর তার কথা মনে পড়ছে। বিভিন্ন কথা ভাবতে ভাবতে হঠাৎ বশিরও ঘুমিয়ে  পড়ে। 
ট্রেন কুমিল্লার কাছাকাছি। পাঁচ ছয়জন মুখোশধারি লোক বশির ও বাবলুর বুকে পিস্তল ধরে বলল, টাকা পয়সা সোনা দানা কাপড় চোপড়  যা আছে সব দিয়ে দে নয়তো ফুটা করে দিব।
আমেনা বেগম ডাকাতদের পায়ে ধরে বলেন, দয়া করে আমাদের যা কিছু আছে সব নিয়ে যান তবুও আমার বাজানদের মারবেন না। বশির ডাকাতদের সাথে একটু জোর করায় মাথায় একটু আঘাত লাগে তাতে ও অজ্ঞান হয়ে যায় । সামনের স্টেশনে ট্রেন থামলো বশিরকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হল। এত রাতে কী আর রোগী ভর্তি করা যায় ! তবু অনুরুধ করে ভর্তি করা হল। সেদিন আর বাসায় ফেরা হল না। রক্তে বশিরের দেহ ভিজে গেছে। ডাক্তার বললেন, মাথায় আঘাতটা একটু বেশী লেগেছে ব্রেনের ওপর চাপ পড়েছে, বলা যায় না কী হবে। আল্লাহকে ডাকেন।
এই অচেনা এলাকায় বাবলু ও আমেনা বেগম অন্থির হয়ে পড়লেন, কোন চেনা জানা নেই। কী করবেন ভেবে পাচ্ছেন না। অনেকক্ষণ পরে হঠাৎ বশির চোখ খুঁললো কিন্তু কোন কথা বলছে না। শুধু মা আমেনা বেগম ও বাবলুর দিকে তাঁকিয়ে আছে।
বশির বিছানায় শুয়ে আছে, আমেনা বেগম তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, এখন কেমন লাগছে? গতকাল রাতে ট্রেনে আমাদের ওপর ডাকাতরা আক্রমণ করেছিল তখন তুই মাথায় আঘাত পেয়েছিলি আর এই হাসপাতালে এনেছি।
আমি কেন ট্রেনে যাবো, আমি তো আপনাদের চিনি না। আপনারা কে? আমার নন্দিনি কোথায় যাকে নিয়ে আমি পাহাড়ে বেড়াতে গিয়েছিলাম। হঠাৎ পা পিছলে পড়ে যাই।
আমেনা বেগম অবাক হয়ে বশিরের পানে তাঁকিয়ে রইলেন। বললেন, বাবা বশির আমি তোর মা আর বাবলু তোর ছোট ভাই। আমাদেরকে চিনতে পারছিস না?
কি আবোল তাবোল কথা বলছেন। আপনারা কেন আমার মা ও ভাই হবেন? আমার মায়ের নাম মনিকা বাপের নাম করিম শেখ আর আমার একমাত্র বোন চাপা।
 আমেনা বেগম ডাক্তারকে পাশের ঘরে ডেকে নিয়ে বললেন, একি হয়ে গেল, আমার ছেলে আমাকে চিনতে পারছে না। বাবলুকেও অস্বীকার করছে।
ডাক্তার বললেন; একটি সত্যি কথার উত্তর দিন। বশির কি আপনার পেটে ধরা সন্তান নাকি পালিত সন্তান?
কিছুক্ষণ চুপ থেকে আমেনা বেগম বলেন, বশির আমার পেটে ধরা সন্তান না হলেও নিজের সন্তানের মত স্নেহ মমতা দিয়ে বুকের মাঝে আগলে রেখেছি। কখনও বুঝতে দেইনি দুঃখ কষ্ট কাকে বলে। আর সেই সন্তান যদি আমাকে অস্বীকার করে তাহলে কেমনে বাঁচবো, বলেন ডাক্তার সাহেব?
ওদিকে বশির বলছে, আমি বাবা মার কাছে যাবো, আপনাদের সাথে যাবো না। আমেনা বেগম কাছে গিয়ে বললেন, আগে আমাদের বাসায় চলো তারপর ঠিকানা জেনে তোমাকে তোমার বাবা মা’র কাছে পৌচ্ছে দিব।
ওরা তিনজন গাড়ি চড়ে প্রায় বিকাল চারটার সময় বাসায় ফিরলো। আমেনা বেগমের মনে কোন শান্তি নেই শুধু ফুপিয়ে কাঁদছেন কিন্তু প্রকাশ করতে পারছেন না। বশিরকে তার ঘরে নিয়ে বললেন, মনে করে দেখো তো বশির এই ঘরে তুমি থাকতে গান গাইতে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে। এসব মনে করার চেষ্টা করো !
অন্য কী ঘটেছে আমি জানি না, শুধু আমার চোখের সামনে ভাসছে মা বাবা আমাকে ডেকে বলছেন, ওরে খোকা আমার বুকে আয়। এক মাত্র বোন চাপা, তার মুখ থেকে কতদিন যেন ভাইয়া ডাক শুনিনা। আমি তাদের কাছে যাবো আমাকে সেখানে নিয়ে চলুন। আচ্ছা আপনাদের সংসারে আমার আগমন কতদিন ধরে?
মা আমেনা বেগম একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে উত্তর দিল। গত দুই বৎসর যাবৎ তুমি আমাদের সাথে আছ। এর মাঝে কোনদিন তোমার বাবা মা বোনের কথা তুমি বলোনি। তারা বেঁচে আছে না মরে গেছে তাও তুমি তখন বলতে পারোনি, শুধু কেঁদেছো। আমার ইচ্ছায় তোমায় আমার সন্তানের মত লালন পালন করেছি।  তারপর তোমাকে ক্লাস নাইনে ভর্তি করে দিলাম এ বছর তুমি ক্লাস টেনে।
আমি তো এস এস সি পাস করেছি। যাক- আমাকে যেহেতু আপনি ছেলের মত আদর দিয়ে স্নেহ দিয়ে বুকে ধরে রেখেছেন, সেহেতু আপনি আমার মা। মা আমাকে বলুন, আমাকে কিভাবে খুঁজে পেলেন?
সেদিন আমি আমার এক মাত্র সন্তান বাবলুকে নিয়ে আমার এক আত্মীয় বাড়িতে বেড়াতে যাচ্ছিলাম। প্রায় সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছিল। চারদিকে অন্ধকার, আকাশটা মেঘে ভরা, মেঘের গর্জন মাটি কাঁপিয়ে তুলছিল। তবুও পথ দিয়ে হাঁটছি। হাতে ছিল টর্চ লাইট। হঠাৎ কাছেই পথের ধারে একটা মানুষ পড়ে থাকতে দেখি। রক্ত মাখা মুখ, রক্তে সারা শরীর ভিজে গেছে। মাথায় ক্ষত দাগের চিহ্ন। কনকনে শীতে কাঁপছে। আমি আর বাবলু তাকে তাড়াতাড়ি তুলে মূল পথে নিয়ে এলাম। অনেক কষ্টে একটা ভ্যানে তুলে হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। ডাক্তার বললেন, অনেক রক্তক্ষরণ হয়েছে, রক্ত দিতে হবে। ভাগ্য গুণে ঐ হাসপাতালে রক্ত পেয়ে গেলাম। পরের দিন সকাল দশটায় ছেলেটির জ্ঞান ফিরলো। আর আত্মীয় বাড়িতে যাওয়া হল না। আমি জিজ্ঞাসা করলাম তোমার নাম কি? তোমার বাড়ি কোথায়? কে কে আছে তোমার?
কোন উত্তরই দিতে পারল না। শুধু কাঁদতে থাকে। আর সেই থেকে তাকে আমাদের মাঝে রেখে দিলাম। তুমিই হলে সেই বশির। আর কখনও জানতে চাইনি তোমার পরিচয়। নিজের সন্তান বাবলুর সাথে তোমাকেও আদর স্নেহ ভালবাসা দিয়ে বুকে আগলে রেখেছি। কখনও বুঝতে দেইনি তুমি আমার সন্তান না। আজ আমার বুকটা ভেঙ্গে যাচ্ছে কেমনে তোমাকে বিদায় দিব? আচ্ছা বশির তোর পুরানো জীবন সম্পর্কে সব মনে আছে?
জি সব মনে আছে। আপনাকে সব বলব যদি শুনতে চান।
তাহলে বল..
                                                               সমাপ্ত                                     
কবি ও কবিতা

কবি ও কবিতা

রাত নয়টার ফ্লাইটে খলিল মিয়া ঢাকা ত্যাগ করবেন। যাবেন বিদেশ টাকা রোজগারের জন্য । বেলা এগারোটার মধ্যে বাড়ি থেকে বিদায় নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। সাথে এগিয়ে দিতে কালুর মামা যান।
দু-মাস মাস পেরিয়ে যায় খলিল মিয়ার কোন খোঁজ খবর পাওয়া যাচ্ছে না। বাড়ির সবাই চিন্তায় খাওয়া দাওয়া ছেড়েই দিয়েছে। বীণা শুধু জানতে চায় বাবা কবে আসবে মা ? বাবার কথা খুব মনে পড়ছে।
তাহের মিয়া বাহির থেকে ডাকছেন, কালু ঘরে আছিস ? এই নি তোর বাপের চিঠি এসেছে। কালু দ্রত ঘরের বাহিরে এসে চিঠিটা নিয়ে বীণা ও মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ছে। সবার মনে একটা অজানা আশঙ্কা, না জানি কী খবর ! চিঠি পড়া শেষ, মনটা মোটামুটি শান্ত হল । 
এভাবেই খলিল মিয়ার বিদেশ কাল পাঁচ বছর পেরিয়ে গেল। বিদেশ থেকে নিয়মিত টাকা পাঠান। সেই টাকা দিয়ে দুই সন্তানের পড়াশোনাসহ সংসার চলছে।

খলিল মিয়া পাঁচ ক্লাস পর্যন্ত লেখা পড়া করেছিলেন তারপর আর লেখাপড়া করার ভাগ্য হয়নি। তিনি অন্যের জমি বর্গা চাষ করতেন, সারাদিন কাজ করে রাতে ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। ছেলে কী লেখাপড়া করছে তা দেখার জন্যে দুই মাইল দূরে নিজের কাজ বাদ দিয়ে মাঝে মাঝে কালুর স্কুলে যান। কালু তার নানার বাড়িতে থেকে ওখানের স্কুলে পড়ে। ক্লাসে ঊপস্থিতি কম। তাতে খলিল মিয়া সন্তুষ্টি হতে পারেন না। ওই স্কুল বাদ দিয়ে আবার নিজের গ্রামের স্কুলে ভর্তি করে দেন। এভাবেই চলতে থাকে ।
    পরীক্ষা শেষে ভাই বোন মিলে নানা নানীর বাড়ি বেড়াতে যায়। ওখান থেকে মেঝ মামীর মেয়ে হয়েছে তাকে দেখতে যাবে তাদের বাড়িতে। নৌকায় চড়ে যাবে। নৌকায় চড়ে আত্মীয় বাড়ি যাওয়ার মজাই আলাদা। এক লাফে নৌকা থেকে নেমে দৌড়ে মামীর বাড়ির দিকে চলে যায়।
    কী সুন্দর চেহারা ! আকাশ থেকে যেন চাঁদ খানা ছিড়ে এসেছে, আর তা সবাই দেখছে। বীণা বলল, ভাইয়া কিছু ভাবছো?
    কী আর ভাববো বিধাতার সৃষ্টি দেখলাম ।
    দুপুরের খাওয়া শেষ করে বিকেলের দিকে ওরা সবাই আবার বাড়ি ফিরলো। বীণা বলল, ভাইয়া মেয়েটি নাম কি রেখেছে?
   ঝরনা ।
   কী সুন্দর নাম ! মনে হয় পাহাড় থেকে কলকল শব্দে জল নামছে, তাই না?
   কবি হয়ে গেলি নাকি?

খলিল মিয়া ভাবছেন এই অভাবের সংসারে কিভাবে সন্তান দুটোকে মানুষ করব ! বিদেশ গেলে কেমন হয় ! কিন্তু এত টাকা পাব কোথায় ? যেখানে দু-বেলা দু-মুঠো ভাত জোটে না, সেখানে আবার বিদেশ !
      বছিরন বিবি কাঁধে হাত দিয়ে বললেন, কি ভাবছো ?
      ভাবছি এই অভাবের সংসার আর কত দূর ! সন্তানদের লেখাপড়া করাতে হবে। বিদেশ গেলে কেমন হয়?
      ঠিক কথা বলেছো। আমার বাপের বাড়ি থেকে হাজার বিশেক টাকা আনতে পারবো আর বাকি টাকা আমাদের ঘরের পূর্ব দিকের জমিটা বিক্রি করলে হয়ে যাবে।
      বাপের পুরানো জমিটা বিক্রি করলে তো আর কিছুই থাকলো না। থাক যাবো না।
      জমি দিয়ে তুমি কি করবে, সন্তানদের যদি শিক্ষিত করতে না পারলে? এতোকাল তো অন্যের কাছে মুজুরী খাটতেই গেল।
      খলিল মিয়া ভাবলো যুক্তিটা মন্দ হয় না। সন্ধ্যা দিকে কালু ও বীণা বাড়ি ফিরল। মা, মা, বলে মাকে জড়িয়ে ধরলো ওরা ভাই বোন। বছিরন বিবি বলেন, সাত দিন যেন সাত বছরের মত মনে হয়েছে। বীণা বলে মা আমরা ভাই বোন যদি কোথাও হারিয়ে যাই তাহলে তুমি কি করবে? 
      অমন কথা বলতে নেই। তোরা আমার প্রাণ তোরা আমার জীবন।
      কাদের মিয়া দাঁড়িয়ে সন্তান ও বউয়ের দৃশ্য দেখে ভাবছেন, এই সন্তানদের রেখে কেমনে আমি বিদেশ গিয়ে থাকবো ! কেমনে দু-চোখের আড়াল করে রাখবো ! পরক্ষণে আবার নিজেকে বুঝায়। সন্তান ও স্ত্রীর এই হাসি ভরা মুখ দেখতে চাইলে আমাকে বিদেশ গিয়ে টাকা উপার্জন করতেই হবে, এই আমার প্রতিজ্ঞা। 
      বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফল হয়েছে। কালু প্রথম হয়েছে। বাপ ছেলেকে নিয়ে যে আশা করতেন আজ তার বাস্তবায়ন শুরু । খলিল মিয়া বুক ভরে নিঃশ্বাস নিয়ে খোদার কাছে দোয়া করছেন- তুমি বাজানরে অনেক জ্ঞান বুদ্ধি দান করো।

      গ্রামের দুষ্ট ছেলেদের সাথে কালু চলাফেরা করে। রাত দশটার সময় বাড়ি ফেরে। একদিন ওর মা বলেন, তোর এই ব্যবহারের জন্য কী তোর বাপ বিদেশ থাকতেছে এত কষ্ট করে?
      স্কুলের গন্ডি কালু এখনো পার করতে পারেনি। লেখাপড়ায় তেমন ভালো না। বাড়ি থেকে প্রতিদিন স্কুলের কথা বলে যায় কিন্তু স্কুলে যায়না, কোথায় যেন চলে যায়। ক্লাসের উপস্থিতি খুবই কম। মায়ের কথা কালু শুনে না। ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণীর বার্ষিক পরীক্ষায় দুইবারই ফেল। তবুও সে খবর বাপকে জানানো হয়নি।
      মায়ের কথায় কালু কোন জবাব দেয় না। ঘরে গিয়ে বসে ভাবে, আমি ভালো হয়ে যাবো। ভালো ভাবে লেখাপড়া করবো। বাবা মায়ের আশা পূরণ করব। পরের দিন সকালে কালু স্কুলে যায় । আজ কোন স্কুল পালানো নয়, সরাসরি ক্লাসে যাচ্ছে। পথে তার একই বয়সের অনেকেই বলল, আবার স্কুলে যাওয়া শুরু করলি নাকি? কালু বলে কি আর করবো, এভাবে আর কতদিন বাউন্ডুলে হয়ে ঘুরবো? তোরাও আমার পথে যোগ দে।
     রাত অনেক হয়েছে। বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিলে কী সময়ের কথা মনে থাকে ! পথ দিয়ে যাচ্ছে আর বিন্দিয়ার কথা ভাবছে। হঠাৎ উহ্‌ শব্দে কালু মাটিতে পড়ে গেল। মাথা থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। আর কিছু মনে নেই।
      ঘটনাটা দুদিন আগেই হয়েছে। স্কুলে গানের অনুষ্ঠান ছিল। সেখানে কালু ও বিন্দিয়াসহ অনেকেই গান গেয়েছে। ভালো গানের জন্য পুরস্কারে ব্যবস্থাও ছিল। কালু ও বিন্দিয়া তা পায়। বিন্দিয়ার চাচাতো ভাই ববিও গান গেয়েছিল কিন্তু পুরস্কার পায়নি।
      স্যার হাত তুলে কালু ও বিন্দিয়াকে ভালো গানের জন্য প্রশংসা করে। ববির তা সহ্য হয়নি। পরের দিন কালু ও বিন্দিয়া হাতে হাত রেখে অনেকক্ষণ হেঁটে হেঁটে গল্পও করেছে, তা ববি দেখেছে। নিজের চাচাতো বোনের হাতে হাত রেখেছে কালু ! যে করেই হোক ওকে শাস্তি পেতেই হবে, ববির এই প্রতিজ্ঞা। দিনটাও পেয়ে যায়। সাথে ববির আরও সহযোগি ছিল।
      এক বিপদের ওপর আরেক বিপদ। কিছুক্ষণ আগেই বিদেশ থেকে খবর এসেছে খলিল মিয়ার অবস্থা খারাপ। তিনি অসর্তকতায় উপর দিকে তাঁকিয়ে কাজ করতেই পা ফসকে এক কুপে পড়ে যান। অনেক্ষণ পরে তাঁকে তুলতেই দেখে অর্ধেক মৃত হয়ে গেছে। প্রয়োজনিয় অক্সিজেনের অভাব ছিল কুপে। হাসপাতালে ভর্তি আছেন। বলা যায় না কী হবে !
      কালুও হাসপাতাল বেডে শুয়ে আছে, সাথে মা ও বোন। অতিরিক্ত রক্ত ক্ষরণে শরীরটা সাদাটে হয়ে গেছে। ইতিমধ্যে এক ব্যাগ রক্তও দেওয়া হয়েছে। বাপের খবর কালুকে জানানো হয়নি। শুধু বছিরন বিবি ও বীণা তা ভেবে আড়ালে চোখের জল ফেলছে।
      পরিবার থেকে সকল স্বপ্ন ধুয়ে মুছে গেল। ক’দিন আগেও স্বপ্নের সাঁকো সচল ছিল, পরিবারে সুখ ছিল। কালু নেই, তার বাপও নেই। বছিরন বিবি এক গভীর জলে পড়ে হাবুডুবু করছে, কোন ঠিক ঠিকানা নেই।
বীণার বয়স হয়েছে। টাকার অভাবে বিয়ে দিতে পারছেন না মা। অনেক ঘটকের কাছে বলে রাখলেও লাভ হচ্ছে না। মা মেয়ে শুয়ে আছে। ঘরের বেড়া পাট খড়ি দিয়ে বাঁধা। রাতে বেড়ায় মাঝে মাঝে খটখচ শব্দ করে। মায়ের মন চমকে উঠে। ঘরে যুবতি মেয়ে, কে না আবার কোন চিন্তায় কী করে ! নিজের চিন্তা তিনি করেন না, মেয়েটোকে বিয়ে দিতে পারলেই সকল পাওয়া হবে।
     বাড়িতে অনেক মানুষের ভীড়। এক সাথে মা ও মেয়ের জানাযার হবে। গত রাতেই ঘটনাটা হয়েছে। ছিল ঝড়ের রাত। চিৎকার করলেও বেশী দূরে শব্দ যায়নি। এসেছিল বীণাকে তুলে নিতে, তাতে বছিরন বিবি বাধা দেওয়ায় তাঁকেও মরতে হল।
       কেউ নেই সংসারে। কে মামলা করবে? সরকার বাদী হয়ে করবে? কোন ফায়দা নেই। কয়েকবার হাজিরা চলবে আসামীদের, তারপর সব ঠিকঠাক হয়ে যাবে। একটা পরিবার ধ্বংশ হল। সেই সংসারের কটা মানুষের স্বপ্ন আশা চুরমার হয়ে গেল।
                                                               সমাপ্ত






কবি ও কবিতাএলার্ম দিয়ে রাখা ঘড়িটা বেজে ওঠছে। অবিরাম ভাবে এক মিনিট বাজার পর পাঁচ মিনিট বিরতি দিয়ে আবার শুরু হয়। এভাবেই আধা ঘন্টা ধরে চলছে। রাতের বেলায় ক্ষুদ্র শব্দও অনেক দূর চলে যায়। আর তা যদি হয় জোছনা রাতে তবে তো কথাই নেই। জোছনা ও অন্ধকার রাতে শব্দ আলাদা ভাবে কম  কি বেশী দূরের যাওয়ার কারণ নেই।  যে যেটা পছন্দ করে সে সেটাকেই এগিয়ে রাখবে। লেখকের মনোভাব হয়তো জোছনার প্রতি দূর্বল আছে।  তাই তিনি জোছনাকে প্রধান্য দিচ্ছে।
    যা-ই হোক, আজ জোছনা নেই, অন্ধকারের সাথে সামান্য মেঘের ভাব। এই বৃষ্টি নামছে আবার এই থেসে যাচ্ছে। মজু এই অল্প বৃষ্টির মধ্যেই কাক ভেজার মত হয়ে কাঁপছে। এখনো বাসায় যেতে অনেক পথ পড়ে আছে। শহরই পেরুতে পারেনি, তারপর সেই গ্রাম। বাড়িতে যাওয়ার ভাবনা বাদ দিয়ে আশেপাশেই কোথাও রাতটা পার করার কথা ভাবছে। কিন্তু কে দেবে তাকে এমন ভরসা !
    এই এলাকায় মজুর অনেক যাতায়াত থাকলেও পরিচিত কেউ নেই। তাছাড়া দোকানপাট বন্ধ করে বাসায় চলে গেছে সবাই। যারা জেগে আছে তারা সবাই নাইট গার্ড কিংবা চিরচেনা কুকুরের দলপল।
    রাতের বেলায় সাধারণত ওরা সবাই একত্রে বসে আলাপ করে। গার্ডদের সাথে কুকুরদের ভালো মিল মহাব্বত থাকে। ভয়ের সময় যখন চিৎকার করার সুযোগ থাকে না তখন ওই কুকুরগুলোই ঘেউ ঘেউ করে লোকজনকে জাগাতে সাহায্য করে। চোর কিংবা ডাকাতদের পরিকল্পনা বিফলে যায়।
    মজু এদিক সেদিক তাঁকিয়ে কোন মানুষের দেখা না পেয়ে কিছুটা ভয়ে পেলো। ব্যাগের পকেটে থাকা একটা কলা বের করে খেতে খেতে মূল পথের দিয়ে এগিয়ে যায়। একটা ছোট আলো দেখা যাচ্ছে, পাশেই কয়েকজন গল্প করছে। মজু পকেটে থাকা ক’টা টাকা পায়ের সু-য়ের মোজার ভিতরে রেখে মাথার চুল চিরুনি দিয়ে আঁচড়ে গিয়ে বলল, এই যে ভাই,  আমি খুব বিপদে পড়েছি। একটু সাহায্য করতে পারেন ?
    দূর থেকে অনেক লোকের আলাপচারিতার ভাব দেখা গেলেও আসলে ততজন নয়। দু্‌জন লোকের একজন ইয়া মোটা কালো ও খাটো, পরের জনও কালো তবে কঙ্কাল। সুট টাই পড়া দেখে ওরা দুজন বলল, তা মাল পানি আছে নাকি? কিছূ ফালান, তয় ভাইবা দেখার পামু কি করা যায়।
    মাল পানি কি মজু বুঝতে না পেয়ে আবার জানতে চায়, আমার কাছে কোন পানি নেই, একটু ছিল কলা খাওয়ার পর খেয়েছি।
    লোক দুটো শোয়া থেকে ওঠে তাদের নিজেদের মাঝে কথা বলে, আজকের ইনকাম মনে হয় বালা অইবো। মজুর দিকে তাঁকিয়ে  বলে, বাড়ি কেলা, কই যাইতান ?
    এমন খাপ ছাড়া আঞ্চলিক ভাষা মজু বুঝতে না পেয়ে অবিরাম মাথা নাড়তে থাকে। এমন বিপদের সময় কোন কিছুতে না বলতে নেই। মোটা লোকটা উঠে মজুর দাঁড়িয়ে থাকার চারপাশে একটা চক্কর দেয়। সাথে থাকা লাঁঠি দিযে মজুর ব্যাগে খোঁচা দেয়। বলে, ব্যাগে কি আছে ? চিকন লোকটাও একই ভাবে চক্কর দেয়। মোটা লোকটাকে সন্ত্রাসী ধরনের মনে হলেও চিকনটাকে মনে হয়না। হয়তো নতুন এসেছে, শেখার চেষ্টা করছে।
    ফিল্মে একটা নায়িকাকে ঘিরে যেমন গুন্ডারা চারদিকে চক্কর দেয় তেমন করছে। মজু বুঝতে পারল, কিছু একটা হবে। ব্যাগে কিছু নেই কিন্তু' সমস্যা হল কিছুই না পেয়ে যদি ছোরা টোরা দিয়ে আঘাত করে ! তখন তো মুখ থেকে সত্য কথা বের হয়ে আসবে। ওই ক'টা টাকার জন্যে তো একটা প্রেমিক জীবন মরে যেতে পারেনা।
    সকল ভয় ফেলে মজু বলল, কি ব্যাপার বলুন তো এমন পাগলের মত ঘুরছেন কেন ? বলুন, আমায় কোন সাহায্য করতে পারবেন কিনা ? ওইতো সামনে আরেকটা আলো দেখা যাচ্ছে নয় তো ওদিকে যাবো।
    মোটা লোকটার চোখের চাহনি ভালো মনে হলো না। মজুকে রেখে সে একটু ভিতরে গেল। মজু পরের জনের কাছে জানতে চায়, টেনিং- এর মেয়াদ কয় দিন হল ? ভালো ভাবে সব কিছু পরখ করো, যখন একা মূল কাজে নেমে পড়বে ভালোভাবে না শিখলে বসের ছোরার ধাক্কা খাবে।
    চিকন লোকটা দাঁড়িয়ে ভাবছে, এ দেখি গুরুর চেয়ে বড় গুরু। আর দেরি না করে সেও ভিতর চলে যায়। একটু পরে দুজনেই একটা চেয়ার নিয়ে এসে মজুকে বসতে দিয়ে বলে, বস আপনার কাজ কোন এলাকায় ? কাশেম ভাইকে চেনেন ? ক’দিন আগেই তিনি বলেছিলেন নতুন বস আসার কথা। আপনি, মনে হয় সেই লোক। বস ভুল হয়ে গেছে, ক্ষমা করে দিন। আপনাকে এক্ষুণি থাকার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।
    মজু হাসবে না কাঁদবে ভেবে পাচ্ছে না। কি বললাম আর কি হল ! সবলের সাথে কখনো দূর্বল ভাব দেখাতে নেই, সবলরা নয়তো দূর্বলকে আরও দূর্বল মনে করে আঘাত করবে ।
    মজুর ক্ষুধা পেয়েছে, বলল, সুটকি মাছের ঝোল দিয়ে ভাত হবে ?
    বস মাফ করেন, এমন পঁচা মাছের ঝোল আপনি খাবেন তা মানায় না, বোয়াল মাছের ঝোল রাঁধা আছে। আজই কাশেম ভাই পাঠিয়েছে, মনে হয় আপনারই জন্যে।
    মজুর জন্য থাকার ব্যবস্থা হল। ভাবছে, কোন ভাবে যদি ওরা জানতে পারে আমি কিছূই না তবে মাগার কাল্লা থাকবে না। শুয়ে শুয়ে মজু অনেক কিছুই ভাবছে। এখন রাত দুইটার কাছাকাছি, আর ঘন্টা দুই পরেই ফজরের আযান হবে, তার আগেই বিদায় হতে হবে। আসলজন এসে গেলে আমাকে কেউ বাঁচাতে পারবেনা। বাহিরে ওদের দুজনের সাথে আর ক'জন মিলে পাঁচ ছয়জন হয়েছে। নিজেদের মাঝে আলাপ হচ্ছে, আজ অন্য সব কাজ বাদ, বসের সেবা করতে হবে। সেবার কমতির খবর ছোট বস জানলে মরার পর লাশ কবরেরও যাবেনা।
    মজু ভাবছে, প্রথমে কোন ভরসা না পাওয়াই ছিল শূভ, এখন পেয়েও মহা সমস্যা। বুকের ভিতরে কাঁপা কাঁপা ভাব। বিভিন্ন বুদ্ধির ভীড়ে আসল যে বুদ্ধিটা এখান থেকে মুক্ত হওয়া পথ বের করবে তা ধরা দিচ্ছে না। নিজের মাথায় দুটো মৃধূ থাপ্পড় দিলেও কাজ হচ্ছেনা। মজুর বুদ্ধির সবই সমানতরাল, মানে যখন সমস্যায় পড়বে তখন খুলে যাবে বুদ্ধির কারখানা।
    মজু বাথরুমে ঢুকে বেশী করে পানি দিয়ে হাত মুখ ধুয়ে নিল। মরার আগে আর হয়তো পানি পাওয়া যাবেনা। টেবিলে রাখা স্নো পাউডার মুখে ও মাথায় তেল মেখে নিল। পকেট থেকে বের করা ছোট আয়নার মাঝে নিজের চেহেরাটা শেষবারের মত দেখে নিল। পায়ের মোজায় রাখা টাকাটা বের করে বুক পকেটে রাখল, যাতে মরার পর কেউ ওগুলো নিয়ে খরচ করতে পারে।
    মজু এখন ফন্দি করছে, কীভাবে বের হবে। কোন পদ্দতিতে সফল হওয়া যাবে ! হঠাৎ করেই বলল, এই তোরাব কই গেলি ?
    চিকন লোকটা দ্রত এসে বলল, আমি তমিজ, কি করতে হবে বলুন বস ?
    যাক- বাবা নাম তাহলে জানা গেল, প্রথমেই সফল। শোন আমি এসেছি সবার কাজ স্বচক্ষে গোপনে দেখার জন্য, ঘূমানোর জন্যে নয়। বুঝলি ? তাই আমি এখন বের হবো। তোরা এখানেই থাক, চালাকি করে আবার কাছের কাউকে আমি আসছি বলিস না।
    তমিজের পা ষাট কিঃমিঃ বেগে কাঁপছে। হয়তো ভয়ে ও পড়েই যাবে। তার আগেই সরতে হবে, ভাবছে মজু।
    কিছূ দূর যাওয়ার পরই তার মত একজন লোককে মজু সামনে পেলো। কাঁধে ব্যাগ ঝুলানো। মুখটা শুকিয়ে গেছে। জানতে চাইল মজুর কাছে, কোথায় যাবেনা ভাই ?
    অপরিচিত লোকদের কাছে রাতের বেলায় দূরে যাবো, বিপদে পড়েছি এমন কথা বলতে নেই। তবুও মজু বলল, চলেন একটু ওদিকে গিয়ে বসি। আমি আর আপনি হয়তো একই বিপদে পড়েছি। কোন দিকে যাবেন ? দেখি উভয়ে উভয়কে কোন সহযোগিতা করতে পারি কিনা?
    না, আমি অবশ্য খুব বিপদে নেই, হয়তো আমার লোকেরা কাছেই আছে। ফটিক ও তমিজ।
    তমিজের নাম শুনেই মজু বসা থেকে ওঠে দাঁড়ালো। মনে ভয় লেগে গেল। ভাবছে, তমিজরা যে বসের আশায় আমাকে এতো আদর যত্ন করল উনি মনে হয় তিনি। কোন রকম ছুঁতো দিয়ে অন্য দিকে থাকতে পারে এমন দিশা দিয়ে লোকটাকে যেতে বলল।
    মজু পেছনে আর না তাঁকিয়ে পথ ধরে যাইতেছে। ড্রিম লাইটের আলোতে চলতে কোন ভয়ই হচ্ছে না। একটু পর পরই একটা করে দুর পাল্লার গাড়ি দ্রত চলে যাচ্ছে। আর কুকুদের ঘেউ ঘেউ তো নতুন কিছু নয়। এখন ভয় অনেকটা নেই, তবুও...। হাত তুলে মজু দূর পাল্লার গাড়িকে থামাতে চেষ্টা করছে। সব চেষ্টাই বৃথা। এক কিঃমিঃ হাঁটার পর একটু করে পেছনে তাঁকায়, ভয়টা একদম কাটেনি। পেছন থেকে কোন গাড়ির লাইট দেখলেই একটু আড়ালে গিয়ে দাঁড়ায়, বলা যায় না শালারা যদি এসে...। বসকে পেয়ে যুক্তি করে না আবার মারতে আসে মজুকে।
    এতোক্ষণে যে ওদের মাঝে তাকে নিয়ে আলাপ শুরু হয়ে গেছে তা মজু নিশ্চিত ভাবে বুঝে গেছে। এখন মজুকে ওরা পেলে কচু কাটার মত খন্ড খন্ড করবে। প্রায় দশটা গাড়ি দেখে মজু আড়ালে গিয়ে পালিয়েছিল। না, ওরা জানলেও আর আমাকে খূঁজতে আসবেনা। আকাশে মেঘ নেই, এই সময়ে পথের মধ্য দিয়ে আকাশে তাঁকিয়ে গান গেয়ে হাঁটার মজাই আলাদা। সাথে যদি কোন বন্ধু থাকে তাহলে তো সর্বত্তম।
    মজু ভাবছে, স্রষ্টার ইচ্ছায় যদি বাড়ি যেতে পারি তবে কালই ওদের কৃর্তী কলাপের কথা পুলিশকে জানাবো। র‌্যাবের কাছে খূঁলে বলব। ভালো সেজে ভন্ডামি কাজ তখন বেরে হয়ে যাবে।
    পেছন থেকে একটা বাইক হর্ন বাজিয়ে আসছে। মজু মাঝ পথ থেকে হাঁটা বাদ দিয়ে সাইট হল। বাইকটা আর এগুলো না। মজুর সামনে গিয়ে থামল। মজু বাইকের লাইটের কারণে কিছু দেখতে পেলো না। তমিজসহ সেই মোটা লোকটা নেমে সালাম দিয়ে মজুকে বলল, বস, দেখতে এলাম কোন কোন দিকে আপনি খোঁজ খবর নিতেছেন।
    মজুর গলা শুকিয়ে গেছে। পা কাঁপছে। এবার বুঝি আর রক্ষ্যে নেই। মাথা না ঘুরিয়ে চোখদ্বয় চারদিকে হালকা পোচ দিয়ে দেখল বাঁচার কোন পথ আছে কিনা। ডান দিকে লম্বা একটা খাল চলে গেছে। খালে পানি আছে। বাম দিকে কিছূ জোপ জঙ্গলের মত দেখা যায়। সামনে পেছনে মূল সড়ক। এই যখন অবস্থা তখনই কিছুক্ষণ আগে দেখা লোকটি বাইক থেকে নেমে এলো লম্বা একটা দা হাতে নিয়ে। 
    মজুর আত্মা যেন আর বুকে নেই। তিন দিকে তারা আর মধ্যে মজু। একজন ছাড়া বাকি দুজনেই মজুর চেয়ে শক্তিশালি হবে। বিপদের সময় মজুর মাথা থেকে হঠাৎ করেই বুদ্ধি বের হয়। এখন বের হবে কিনা তা ভাবছে। লোক তিনজন প্রশ্ন করে যাচ্ছে। মজু কোন জবাব দিচ্ছে না। তিনজনের হাতে দা ছাড়াও আরও কিছু থাকতে পারে।
    মজু নিজের প্যান্টের চেইন খুলে বলল, সরে দাঁড়ান একটু পেচ্ছাব করতে দিন। মরার আগে আসামী যা বলে তা শোনা উচিত।
    কীসের পেচ্ছার করা মজুর ! এক ফন্দি মাত্র। দ্রুত প্যান্ট ও সার্ট খূলে ব্যাগে ভরল। জুতা পড়ে দৌড়ানো যায় না। তাছাড়া টাকা তো মোজার ভিতরে আছে। মজু বসের কাছে এগিয়ে গিয়ে বলল, মরার পর অনেক সময় শুয়ে থাকতে হবে, ব্যায়াম করা যাবেনা। স্লিম বডিটা থুলথুলে হয়ে যাবো। তাই আজ একটু দৌড়িয়ে লই। আপনার যা দেহ ব্যয়াম না করলে হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। ডায়বেটিক হতে পারে।
    তিনজনই ভাবল কথাটা মন্দ নয়। সবার আগে বসকে দিয়ে সিরিয়ালই মজু সবার শেষের আগে দাঁঁড়িয়ে সবাই দৌড়াতে থাকে। এক কিঃমিঃ যাওয়ার পর মজু পেছন থেকে চিকন মানুষটার গলায় ধরে শ্বাস নালিটা ভেঙে ফেলে ধাক্কা দিয়ে খালে ফেলে দেয়। একটুপর সামনেরজন বলে তমিজ গেল কই?
    মজু বলে আমরা যেতে থাকি, ও পেচ্ছাব করে আসছে।
    পরের দুটোই মোটা। যা-ই হোক। জায়গা মত ধরতে পারলেই কয়েক সেকেন্ডেই অর্ধমরা কিংবা মারা যাবে।  কোন দিন কাউকে একটা ঘুসিও মজু কাউকে দেয়নি। সেখানে একটা আস্ত মানুষকে মেরে ফেলল ! শরীরে ঘামের মধ্যেও সাহসের একটা জোস সৃষ্টি হচ্ছে মজুর। প্রয়োজনে অনেক কিছুই করতে হয়। যা করার তারাতাড়ি করতে হবে, এমন ভেবে মজু সামনের লোকটাকে নিজের পা দিয়ে একটু আটকে দেয়। ধপাস করে পড়ে যায়। বস পেছনে না তাঁকিয়ে চলছে। ও বাবা গো বলার আগেই একই ধারায় গলা চেপে ধরে মজু। ডান পায়ের গোড়া দিয়ে শ্বাস নালিতে দুটো লাথি দেয়।
    দুটো শেষ। এখন যদি বস সব জেনেও যায় কোন সমস্যা করতে পারবে না। পেছন থেকে কোন আনা-গোনা না পাওয়ায় বস পেছনে তাঁকায়। মজু বলে ওদের দুজনেরই হাগুর টান পড়েছে, আসেন আমরা আবার দাঁড়িয়ে থাকবো কেন?
    ওসবের টান নেই আমার, তোর থাকলে সেরে ল।
    আমার ভয় করে, চলেন না একটু, কাছেই দাঁড়িয়ে থাকবেন।
    বস নিজের নাক  চেপে ধরেও আগাম গুয়ের গন্ধ পেলেন। মরার আগে আসামীর আবদার শুনতে হয়,তা বুঝে বললেন, ঠিক আছে চলেন।
    মজুর ছোরা কিংবা বন্দুক চালানোর অভ্যেস না থাকলেও বাংলার বাঁশ চালানোর অভ্যেস আছে। বসার আগে পাশের কোথাও থেকে একটা বাঁশ জোগার করে।
    বস বলে ও দিয়ে কী হবে ?
    শৃগালের ভয় আছে না? আপনি কি ভয় পান ওকে? আর কথা নয়, আপনি দাঁড়ান, তারাতারি বসে পড়ি নয়তো কাপড় নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকতে পারে। পানি ? সমস্যা হয়ে গেল যে বস, আপনি একটু ব্যবস্থা করেন না।
    কীসের হাগুর টান? সবই মজুর চালাকি, ইচ্ছে করলে মজু এখন পালাতে পারে কিন্তু তা করবে না। শালার বসের বাচ্চা বসকে পোন্দানি না দিয়ে যাওয়া নয়। বস একটা সিগারেট ধরিয়ে সুখ টান দিচ্ছে। মজু সে প্যান্ট অর্ধেক খোঁলা অবস্থায়ই পেছন থেকে বাঁশ দিয়ে আঘাত করে সকল দুই নাম্বারি শেষ করে দিল।

    চোখের ঝিম ঝিম ভাব দুহাতে ঘসে মজু বিছানার ওপর বসে থাকে। এলার্মের ঘড়িটা বন্ধ করে, ঘরের চালের দিকে তাঁকিয়ে ভাবে, এ আমি স্বপ্নে কি করলাম ! তিন তিনটা মানুষকে আস্ত খতম করলাম। ভয়ে মজুর গায়ের পশম দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। নিজের হাতের দিতে নজর ফেলে বলছে, এই হাতদ্বয় ! তোরা মানুষ হয়ে মানুষকে মারতে পারলি !   
    ইতিমধ্যে চারদিকে কোলাহল বাড়তে থাকে। ফজরের আযান দিতে আর বেশী দেরি নেই। মজু ওজু করে মসজিদে গিয়ে নামাজর পড়ে স্রষ্টার কাছে ক্ষমার জন্য কাঁদতে থাকে।
                            সমাপ্ত    
                               ০৩-০৮-২০১২
         

sislam8405

{Facebook#https://www.facebook.com}

যোগাযোগ ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

luoman থেকে নেওয়া থিমের ছবিগুলি. Blogger দ্বারা পরিচালিত.
Javascript DisablePlease Enable Javascript To See All Widget